বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫

ডাকসু থে‌কে শুরু হোক আযাদী [আজহারুল ইসলাম সোহাগ]



‌ভোটেই হ‌য়ে‌ছি বিজয় আমরা এটা ভা‌বি না,

মা‌লেক ভাই এর র‌ক্তে আজ ফুল ফু‌টে‌ছে।

তার সুবাস পে‌য়ে‌ছে জা‌তি।


সে গ্রা‌ণে আজ পাগলপারা গোটা দে‌শের জন,

মাকাল ফ‌লের গন্ধ খো‌জে বিপরীত যার মন।

আমরা তা‌দেরও সুবাস বিলায় মন ক‌রে উজার,

এসো স‌বে দেশটা গ‌ড়ি সোনাই মোরা পাহাড়।


যে দে‌শে‌তে একটা ছে‌লেও থাক‌বে না আর হীন,

অমুক নেতা, তমুক নেতা, এ সভ‌্যতার হোক লীন।

চোখ রা‌ঙ্গি‌য়ে কথা বলার দিন যে হ‌বে শেষ,

নেতার চো‌খে তা‌কি‌য়ে র‌বে ভ‌য়ের না‌হি লেশ।


এখন এমন একটা স্বপ্ন মো‌দের হে জা‌তির পা‌ঞ্জেরী

সব কিছু‌তেই দেশটা বড়, এমন সব হ‌বে মুন্জুরী।

নিপাত যা‌বে নিপাত যাওয়ার মত যত দোষকারী,

পাল উড়িয়ে দাড় ধ‌রো ভাই, বৈঠা হ‌তে কান্ডারী।


এগি‌য়ে চলার এইত সময় ঝান্ডা হা‌তে সম্মু‌খে,

থর থর বু‌কে কাপন যারা রাজনী‌তে ভাত মা‌খে।

যা খে‌য়েছ চু‌কি‌য়ে ফেলো, কর্ম খো‌জে বের ক‌রো,

লেজ গো‌টি‌য়ে পথ ম‌াপো, নই দে‌শের জন‌্য হাল ধ‌রো।


আযাদী আযাদী, ভয় ভীতি সব নিপাত যাক,

আমরা সবাই বাচ‌বো এখন, আর যা‌বে না কাটা নাক।

বিশ্বদ্ব‌ারে উচ্চ ক‌রে, শীর নোয়াবার নেই সময়,

আমরাই যে বোনব মালা আগামীর দি‌নের বিশ্বজয়।

মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর, ২০২৫

আমা‌দের ঘর [আজহারুল ইসলাম সোহাগ]

                                       আমা‌দের ঘর কবিতা , আজহারুল ইসলাম সোহাগ, Azharul Islam Sohag



আঠা‌রো বছর ধ‌রে এভাবে ঠাই দা‌ড়ি‌য়ে,
‌যে মানুষগু‌লো আমায় রে‌খে চ‌লে গে‌ল,
সে থে‌কে অনাদ‌রে অব‌হেলায়।
আমার জীর্ণতার ছাপ গু‌লো একে একে,
বে‌ড়ি‌য়ে আস‌ছে অব‌লিলায়,
শীর্ন হ‌চ্ছে চামড়া আর বাহুমূল।
এরপরও ঠাই দা‌ড়ি‌য়ে জরাজীর্নতা নি‌য়ে।
তা‌দের অনেক জ্ঞা‌তিজন এলো গে‌লো,
আ‌মি যে সে  অনাদ‌রেই,
এর পরও ভাল লা‌গে য‌বে আ‌সে,
তা‌দের কেহ আমায় ঘি‌রে।
তখন হয়ত বল ফি‌রে পাই এ বাহুমূ‌লে,
বড় কর্তা গত হবার পর,
‌তোমরা সক‌লে আমায় রে‌খে চ‌লে গে‌লে,
ইট পাথ‌রে ঘেরা দূর শহ‌রের
এর পর থে‌কে আ‌মি একা নিঃসঙ্গ।

বড় রাঙ্গামা‌টিয়, সাভার
১৯ আশ্বিন ১৪২৬

মানুষ কে? [ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত]

                                


নিয়ত মানস ধামে একরূপ ভাব।
জগতের সুখ-দুখে সুখ দুখ লাভ।।
পরপীড়া পরিহার, পূর্ণ পরিতোষ।
সদানন্দে পরিপূর্ণ স্বভাবের কোষ।।
নাহি চায় আপনার পরিবার সুখ।
রাজ্যের কুশলকার্যে সদা হাস্যমুখ।।
কেবল পরের হিতে প্রেম লাভ যার।
মানুষ তারেই বলি মানুষ কে আর?

নাহি চায় রাজ্যপদ নাহি চায় ধন।
স্বর্গের সমান দেখে বন উপবন।।
পৃথিবীর সমুদয় নিজ পরিজন।
সন্তোষের সিংহাসনে বাস করে মন।।
আত্মার সহিত সব সমতুল্য গণে।
মাতাপিতা জ্ঞাতি ভাই ভেদ নাহি মনে।।
সকলে সমান মিত্র শত্রু নাহি যার।
মানুষ তারেই বলি মানুষ কে আর?

অহংকার-মদে কভু নহে অভিমানী।
সর্বদা রসনারাজ্যে বাস করে বাণী।।
ভুবন ভূষিত সদা বক্তৃতার বশে।
পর্বত সলিল হয় রসনার রসে।।
মিথ্যার কাননে কভু ভ্রমে নাহি ভ্রমে।
অঙ্গীকার অস্বীকার নাহি কোন ক্রমে।।
অমৃত নিঃসৃত হয় প্রতি বাক্যে যার।
মানুষ তারেই বলি মানুষ কে আর?

চেষ্টা যত্ন অনুরাগ মনের বান্ধব।
আলস্য তাদের কাছে রণে পরাভব।।
ভক্তিমতে কুশলগণে আয় আয় ডাকে।।
পরিশ্রম প্রতিজ্ঞার সঙ্গে সঙ্গে থাকে।
চেষ্টায় সুসিদ্ধ করে জীবনের আশা।
যতনে হৃদয়েতে সমুদয় বাসা।।
স্মরণ স্মরণ মাত্রে আজ্ঞাকারী যার।
মানুষ তারেই বলি মানুষ কে আর?

কে [ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত]

                                                    


বল দেখি এ জগতে ধার্মিক কে হয়,
সর্ব জীবে দয়া যার, ধার্মিক সে হয়।
বল দেখি এ জগতে সুখী বলি কারে,
সতত আরোগী যেই, সুখী বলি তারে।
বল দেখি এ জগতে বিজ্ঞ বলি কারে,
হিতাহিত বোধ যার, বিজ্ঞ বলি তারে।
বল দেখি এ জগতে ধীর বলি কারে,
বিপদে যে স্থির থাকে, ধীর বলি তারে।
বল দেখি এ জগতে মূর্খ বলি কারে,
নিজ কার্য নষ্ট করে, মূর্খ বলি তারে।
বল দেখি এ জগতে সাধু বলি কারে,
পরের যে ভাল করে, সাধু বলি তারে।
বল দেখি এ জগতে জ্ঞানী বলি কারে,
নিজ বোধ আছে যার জ্ঞানী বলি তারে।

মাতৃভাষা [ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত]

                                             


মায়ের কোলেতে শুয়ে ঊরুতে মস্তক থুয়ে
খল খল সহাস্য বদন।
অধরে অমৃত ক্ষরে আধ আধ মৃদু স্বরে
আধ আধ বচনরচন।।
কহিতে অন্তরে আশা মুখে নাহি কটু ভাষা
ব্যাকুল হয়েছে কত তায়।
মা-ম্মা-মা-মা-বা-ব্বা-বা-বা আবো আবো আবা আবা
সমুদয় দেববাণী প্রায়।।
ক্রমেতে ফুটিল মুখ উঠিল মনের সুখ
একে একে দেখিলে সকল।
মেসো, পিসে, খুড়ো, বাপ জুজু, ভুত, ছুঁচো, সাপ
স্থল জল আকাশ অনল।।
ভাল মন্দ জানিতে না, মল মুত্র মানিতে না,
উপদেশ শিক্ষা হল যত।
পঞ্চমেতে হাতে খড়ি, খাইয়া গুরুর ছড়ি,
পাঠশালে পড়িয়াছ কত।।
যৌবনের আগমনে, জ্ঞানের প্রতিভা সনে,
বস্তুবোধ হইল তোমার।
পুস্তক করিয়া পাঠ, দেখিয়া ভবের নাট,
হিতাহিত করিছ বিচার।।
যে ভাষায় হয়ে প্রীত পরমেশ-গুণ-গীত
বৃদ্ধকালে গান কর মুখে।
মাতৃসম মাতৃভাষা পুরালে তোমার আশা
তুমি তার সেবা কর সুখে।।

আমি হব সকাল বেলার পাখি [কাজী নজরুল ইসলাম]

                                             


"আমি হব সকাল বেলার পাখি
সবার আগে কুসুম বাগে
উঠব আমি ডাকি।

"সুয্যি মামা জাগার আগে
উঠব আমি জেগে,
'হয়নি সকাল, ঘুমোও এখন',
মা বলবেন রেগে।

বলব আমি- 'আলসে মেয়ে
ঘুমিয়ে তুমি থাক,
হয়নি সকাল, তাই বলে কি
সকাল হবে নাক'?

আমরা যদি না জাগি মা
কেমনে সকাল হবে ?
তোমার ছেলে উঠবে মা গো
রাত পোহাবে তবে।

আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে [কাজী নজরুল ইসলাম]

                                         


আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে–
মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর টগবগিয়ে খুন হাসে
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে।

আজকে আমার রুদ্ধ প্রাণের পল্বলে -
বান ডেকে ঐ জাগল জোয়ার দুয়ার – ভাঙা কল্লোলে।
আসল হাসি, আসল কাঁদন
মুক্তি এলো, আসল বাঁধন,
মুখ ফুটে আজ বুক ফাটে মোর তিক্ত দুখের সুখ আসে।
ঐ রিক্ত বুকের দুখ আসে -
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে!

আসল উদাস, শ্বসল হুতাশ
সৃষ্টি-ছাড়া বুক-ফাটা শ্বাস,
ফুললো সাগর দুললো আকাশ ছুটলো বাতাস,
গগন ফেটে চক্র ছোটে, পিণাক-পাণির শূল আসে!
ঐ ধূমকেতু আর উল্কাতে
চায় সৃষ্টিটাকে উল্টাতে,

আজ তাই দেখি আর বক্ষে আমার লক্ষ বাগের ফুল হাসে
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে!
আজ হাসল আগুন, শ্বসল ফাগুন,
মদন মারে খুন-মাখা তূণ
পলাশ অশোক শিমুল ঘায়েল
ফাগ লাগে ঐ দিক-বাসে
গো দিগ বালিকার পীতবাসে;

আজ রঙ্গন এলো রক্তপ্রাণের অঙ্গনে মোর চারপাশে
আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে!
আজ কপট কোপের তূণ ধরি,
ঐ আসল যত সুন্দরী,
কারুর পায়ে বুক ডলা খুন, কেউ বা আগুন,
কেউ মানিনী চোখের জলে বুক ভাসে!
তাদের প্রাণের ‘বুক-ফাটে-তাও-মুখ-ফোটে-না’ বাণীর বীণা মোর পাশে
ঐ তাদের কথা শোনাই তাদের
আমার চোখে জল আসে
আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে!

আজ আসল ঊষা, সন্ধ্যা, দুপুর,
আসল নিকট, আসল সুদূর
আসল বাধা-বন্ধ-হারা ছন্দ-মাতন
পাগলা-গাজন-উচ্ছ্বাসে!
ঐ আসল আশিন শিউলি শিথিল
হাসল শিশির দুবঘাসে
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে!

আজ জাগল সাগর, হাসল মরু
কাঁপল ভূধর, কানন তরু
বিশ্ব-ডুবান আসল তুফান, উছলে উজান
ভৈরবীদের গান ভাসে,
মোর ডাইনে শিশু সদ্যোজাত জরায়-মরা বামপাশে।

মন ছুটছে গো আজ বল্গাহারা অশ্ব যেন পাগলা সে।
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে!
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে!!

ব্যাচেলার [আজহারুল ইসলাম সোহাগ]

 

ব্যাচেলার কবিতা , আজহারুল ইসলাম সোহাগ, Azharul Islam Sohag


সুখহীন জীবনে
স্বাধীন ভাবে বেচে থাকা।
শধু বসে বসে কল্পনার
ছবি আঁকা।
অবসরে আড্ডায় মেতে থাকা।
সবকিছু সিরিয়ালে
সেরে নেওয়া।
যখন খুশি তথন
গেহ ফেরা।
আলস্যের ঘুমেতে
মাতাল হয়ে পরে থাকা।
ঘুমেতে মাতলামির ভাব ধরা।
কিছু হাসি, কিছু দু:থ, কিছু বেদনা,
জীবনের সঙ্গি করা।
ভাবনা চিনতা এ জীবনের,
অকসান করে শেষে যাবে;
বসে বসে দিন গোনা।
এটা সেটা কতই
আর কিছু দরকার কি?
ভাত রেধে হয়ে যায় জাও!
ধৌতে গেলে  পাচ জনের চাল;
ঘয়ে যায় দু’জনের ভাত।
তরকারি কোনটাতে লবন বেশী।
কোনটা খেলে মনে হয়;
আগুন লেগেছে বুঝি।
তাই শেষে বাধ্য হয়ে
ডিম ভাজা খায়।
আলু গুলো টিপতে গিয়ে
দেখে শেষে ডিমটা পুড়ে গেছে।
এ কপালে বুঝি আর
স্বাধ নাই ভাল রান্নার,
এ জীবনে।
পুড়া-টরা বাঝি-বোঝি
এটা ওটা সেটা ঝোটা
খেয়ে খেয়ে কোন রকম
কাজে যাওয়া।
এ ব্যাচেলারের নিত্য
পাওয়া।

মধ্যবাড্ডা ঢাকা
৩ জৈষ্ঠ, ১৪১৪

আমরা সেই সে জাতি [কাজী নজরুল ইসলাম]

                                         


ধর্মের পথে শহীদ যাহারা আমরা সেই সে জাতি।
সাম্য মৈত্রী এনেছি আমরা বিশ্বে করেছি জ্ঞাতি।
আমরা সেই সে জাতি।।

পাপবিদগ্ধ তৃষিত ধরার লাগিয়া আনিল যারা
মরুর তপ্ত বক্ষ নিঙ্গাড়ি শীতল শান্তিধারা,
উচ্চ- নীচের ভেদ ভাঙ্গি দিল সবারে বক্ষ পাতি।
আমরা সেই সে জাতি।।

কেবল মুসলমানের লাগিয়া আসেনি ক ইসলাম
সত্যে যে চায়, আল্লায় মানে, মুসলিম তারি নাম।
আমির- ফকিরে ভেদ নাই সবে সব ভাই এক সাথী
আমরা সেই সে জাতি।।

নারীরে প্রথম দিয়াছি মুক্তি নর- সম অধিকার
মানুষে গড়া প্রাচীর ভাঙ্গিয়া করিয়াছি একাকার,
আঁধার রাতের বোরখা উতারি এনেছি আশায় ভাতি।
আমরা সেই সে জাতি।।

হৃদয় ভাঙ্গার তরণী [আজহারুল ইসলাম সোহাগ]

 


পদ্ম , মেঘনা , যমুনা, যত নদ নদীর নীরে;
তরণীরা পাল তুলে সাতার কাাঁটে।
ঝটিকা হাওয়ায় কাল বশেখি ঝড়!
ধুনি, নদের তোয় করে ঝরমর।
কেহ জানেনা কভু আসিবে তার অমানিষা!
ঘিড়ে ফেলিবে সর্বত্র যা মহানিষা।
ভেঙ্গে যাবে অর্থ সমাজ পরিবার হবে বেদিশা!
দেশ হাড়াবে তার পুন্য সন্তান, হারাবে আশা!
বাবা হাড়ায়ে তার ছেলেকে, মা হাড়ায়ে সন্তান;
মা শোকে পাথর হয়ে , বাবা করিবে দাফন,
আর আসিবেনা তার , ফিরে সন্তান , কোন জনমে!
বাবা –মা বলে ডাকিবেনা আর ডাকত যেমনে।
বাবা আসিবেনা ফিরে সন্তানের কাছে!
মা, স্বামী শোকে পাগল হয়ে নাঁচে,
ছেলে বাবাকে হাড়ায়ে পরিবার হল অচল,
মা দতি পরে কামড়ায় আচল!
দু’চোখের অশ্রু ঝরে, করে টলমল!
মা এখন বাবার শোকে হয়েছে পাগল,
ছেলে ধরেছে হাল, পারেনা আর;
ভেঙ্গে পরে দুবাহু ক্লান্তিতে হাহাকার।
মা নেই বেঁচে ছেলে কাঁদে কষে!
নিয়েছে ঐ মেঘনা, যমুনা, পদ্মা, ধরা হতে মুছে!
বোন কাঁদে মার তরে, ছেলে হাড়ায়ে মাকে
অশ্রু ঝড়ে পরে আখি থেকে ঝাকে ঝাকে,
বাবার চোখে লেগেছে নিষা দেখে সংসারের হালচাল;
কোথা থেকে কি যেন হয়ে গেল, করে দিল বানচাল।
নিয়েছে মেয়েকে কেড়ে পদ্মার জ্বলে;
আসিবেনা আর ফিরে মোদের নীড়ে!
মেয়ে হাড়ার ব্যাথায়, ভাই পাগল হয়ে যায়।
কি নিদারুণ দৃষ্য চোখে ভাসে হায়।
কোন পরিবার সবি গেল ভেসে!
প্রদীপ জালাবার সংসারে নেই কেহ পাশে;
মেয়ের জন্য নানু কাঁদে, বোনের জন্য মাসি।
নাতি হাড়া বেদনায় নানা যেন নেই ফাঁসি!
মামা কাঁদে , কেঁদে করে হাহাকার
কে যেন তারে করেছে অবিচার,
নই তা, সোহাগের ছোট বোন হাড়ায়ে
কাঁদে কাঁদে সারা গ্রাম জড়ায়ে।
আতœীয় স্বজন বড় আপন জন,
তাদের হারাবার ব্যাথায় কাঁদেনা কোন মন?
তরী পার হবে তোরা হয়ে সাবধান,
ভরা করে নিলে হওয়া থাকে অম্মান;
ডোবিয়া মরিবি তবে না রাখিলে তরীভার।
এমনি মরিরব তোরা নাই আর নিস্তার।
দিন দেখে গান শোনে তব নাও চালা;
হয়ত থাকিবেনা আর কোন বুকে জ্বালা।
যাত্রী ভরা করে ক্ষণ পয়সা লোভে
ডোবিলে ঐ মাঝ দরিয়ায় কি লাভ হবে?
নিমেষে সিক্ত হবে তোর কোটি জাহাজ।
থেমে যাবে তোর উপার্জনের কাজ।
নাবিক আর যত নৌচারি হও সাবধান;
সময় মেনে চলে বাঁচাও আপন প্রাণ।

গাবতলী নরসিংদী
৫ ফাল্গুন ১৪১৪

উদাসীন চোখ এবং সপুংসক [আজহারুল ইসলাম সোহাগ]

 



আ‌মি কবি, তাই লে‌খি ক‌বিতা
                   অথবা গান,
য‌া সুন্দর তা‌তে তাকায় অপলক;
ম‌নের অজা‌ন্তেই  বা‌জে বীণা,
ধোপ ক‌রে উ‌ঠে হৃদয় ধ্ব‌নি।
আমার প্রথমা উদগিরিত স‌মে,
প্রণয় যত বিলা‌নো হ‌য়ে‌ গে‌ছে,
আর বা‌কি নাই লেশ;
‌জীব‌নের শেষ প্রা‌ন্তে আ‌মি,
আজ তা‌রি দেখা পাই;
যে মেটু‌লি‌তে করে নিল ঠাই।
ধোপ ক‌রে উঠা হদয় ধ্ব‌নি!
আ‌লেয়ার আ‌লোর মত মা‌নি;
যত আ‌সে আর যাই আসুক,
‌মোর ‌নেত্র কো‌নের চাহ‌নি‌তে
এ মন যত হাসুক,
জা‌নি এ ক্ষ‌ণি‌কের উচাটন,
দু‌হের মা‌ঝে দূরক্ষ‌নে যাই হোক,
এ‌যে ক্ষ‌নি‌কের ত‌রে ক্ষ‌ণিক প‌রে;
যা আ‌ছে টু‌টে দূ‌রে,
এর পর ফি‌রে যাই ‌সে প্রথমা স‌মে।
যত সুন্দর হে‌রে এ মন যত হয় উদাস!
এক‌পি‌সে মন ঠে‌কে যাই কো‌নে,
জা‌নি ক্ষ‌নি‌কের ত‌রে এ উল্লাস।
তুবুও চলার প‌থে উদা‌সিন ম‌নে,
‌নেত্র যোগল য‌বে তাকাই দিক বে‌দিক,
সুন্দর যত হে‌রে নি‌তে চাই,
হৃদয় মা‌ঝে ক্ষ‌নি‌কের ঠাই,
এরপর ফি‌রে যাই সে প্রথমা স‌মে।
কল্পনা ক‌রি ফি‌রি, ক‌বি য‌বে হয়,
সুন্দরো মা‌ঝে আপনার লয়।
ক্ষ‌নিক বা‌দেই  য‌বে ভা‌ঙ্গে স্বপন,
সুন্দর যা তা সুন্দর  রই,
ভা‌বি যা তা আপনার নই।
তুবুও চায় অপলক,
ক্ষ‌নি‌কের ত‌রে আপনার মা‌ঝে,
কত স্বপ‌নের দেই উ‌কি।
‌তোমার নেত্র কো‌নে সুন্দর হে‌রে;
য‌দি না দেই কোন স্বপ্ন উ‌কি?
নপুংসক তু‌মি অথবা মি‌থ্যেবা‌দি,
এরপর র‌য়ে যাই অবলার কথা
‌চোখের কো‌নে চাইনা অপলক দৃ‌ষ্টি‌তে,
একবার দে‌খে নি‌য়ে, হয় সে শীর নত;
কথার ঝ‌ু‌ড়ি নি‌য়ে ব‌সে যায় শতত
বু‌কের মা‌ঝে সুখ বা‌ধে রমনীর মত!
নীর‌বে সুর তো‌লে যত না বলা কথার,
বালা ত‌বে গান গায় সুরষ‌ীর ব্যাথার,
সুন্দর হে‌রে রামা স্বপ্ন বোনে আভরন;
সপুংসক হে‌রে জুরা‌বে বালার নয়ন।
যত সুন্দর হে‌রে যত পাই ক্ষ‌নিক উল্লাস,
এ যে ক্ষ‌নি‌কের ই বাস,
তাই সব ছে‌ড়ে ফি‌রে যাই প্রথমা স‌মে।
 
২৯ আ‌শ্বিন ১৪২৬                           
বড় রাঙ্গামা‌টিয়া আশু‌লিয়া

দরদাম [আজহারুল ইসলাম সোহাগ]

 দরদাম কবিতা , আজহারুল ইসলাম সোহাগ, Azharul Islam Sohag




নিপীড়িত মানবতা, ব‌ুলি যায় থম‌কে;
‌কোথা থে‌কে কে যেন কি ভা‌বে ধম‌কে!
‌কোথা যেন প্রত‌িবাদ? ভু‌লে গে‌লো তিতুমীর!
বাঁশঝাড় ম‌রে গেছ‌ে, ভে‌বে মোরা নত শীর।

প্রত‌িবাদ থে‌মে গে‌ছে নয় মোরা চঞ্চল,
র‌ক্তের শিরাগু‌লো আ‌ছে য‌দিও অ‌বিকল।
‌চোখ মে‌লে দে‌খি যখন চার‌দি‌কে অনাচার,
ভা‌বি আ‌মি ভাল আ‌ছি, যাক গোল্লায় দেশাচার।

মর‌ছে যে বে‌ঁছে গে‌ছে, এর পর বর্ত‌াবে
‌ফি‌রে এ‌সে আমার উপর সে ঘা পর্তা‌বে।
‌ভে‌বে মোরা নিশ্চুপ ক‌রিনা‌কো প্রত‌িবাদ,
এভা‌ব‌েত‌ো ক্ষ‌য়ে যায় জীব‌নের যত সাধ।

‌জীব‌নের দরদাম সস্তায় বি‌কি‌য়ে,
ভু‌লে গে‌ছি আ‌মি কে, চার‌দিক ফি‌ক‌ে য়ে।
অশান্ত পা‌ঞ্জেরী, দেশটা যে ছেড়া পাল
হাওয়া এ‌সে ঝাপটায়, এ কোন হ‌লো হাল?

মর‌ছে যে জনগন, ঠিক নাই দরদাম,
ভোগ্যপণ্য তো, দাম বা‌ড়‌ে হরদম।
সস্তায় পাওয়া গে‌লে জনগন হয় খুশি,
ত‌বে কিষা‌ণ‌ে চি‌ন্তিত, নে‌মে এল ঘোর ন‌িশ‌ি।

‌নেই কোন সমাধান, নেই কোন সমতা,
পাঞ্জেরী ব‌লে যাও, কোথা খাটাও ক্ষমতা?
বাড়‌ছেতো দরদাম, পর‌ছে‌তো কষাঘাত,
‌নি‌পীড়‌িত মানবতা, হও পাঞ্জেরী উৎখাত।

জা‌নেনা‌তো জনগন, কি‌যে তার অ‌ধিকার,
হয় তারা ব‌ঞ্চিত, ক‌বে হ‌বে প্রত‌িকার,
কার কা‌ছে চা‌বে সে ক‌রে এক চিৎকার;
পা‌ঞ্জেরী ব‌লে যাও, নয় নি‌য়ে যাও ধিক্কার।

সমা‌জের পাটাতন দি‌বো মোর‌া উ‌ল্টি‌য়ে,
‌তিতুমীর ফি‌রে এ‌সো সব বাধা পা‌ল্টি‌য়ে।
যত আ‌ছে অ‌ধিকার দি‌য়ে দাও পা‌ঞ্জেরী,
‌দেশটা‌তো আমা‌দের, তোমাকে যে কি করি।  

শপথ নেওয়ার হয়েছে সময় ছড়া‌তে সুরভী।
মুছে যাক যত বিষে ভরা ক্রেদ হয়ে করবী,
‌ফি‌রে এ‌সে‌ছ‌ি এবার বুঝ‌ে নি‌তে দরদাম,
‌এ‌সো মোর ভাই ভ্রাতা এক সা‌থে করদম।

আশু‌লিয়া, সাভার।
১০ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬




কুলি-মজুর [কাজী নজরুল ইসলাম]

                                       

দেখিনু সেদিন রেলে,
কুলি ব’লে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে!
চোখ ফেটে এল জল,
এমনি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?
যে দধীচিদের হাড় দিয়ে ঐ বাষ্প-শকট চলে,
বাবু সা’ব এসে চড়িল তাহাতে, কুলিরা পড়িল তলে।
বেতন দিয়াছ?-চুপ রও যত মিথ্যাবাদীর দল!
কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোর পেলি বল্‌?
রাজপথে তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে,
রেলপথে চলে বাষ্প-শকট, দেশ ছেয়ে গেল কলে,
বল ত এসব কাহাদের দান! তোমার অট্টালিকা
কার খুনে রাঙা?-ঠুলি খুলে দেখ, প্রতি হঁটে আছে লিখা।
তুমি জান না ক’, কিন- পথের প্রতি ধূলিকণা জানে,
ঐ পথ, ঐ জাহাজ, শকট, অট্টালিকার মানে!


আসিতেছে শুভদিন,
দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ!
হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,
পাহাড়-কাটা সে পথের দু’পাশে পড়িয়া যাদের হাড়,
তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি,
তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি;
তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান,
তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান!
তুমি শুয়ে র’বে তেতালার পরে আমরা রহিব নীচে,
অথচ তোমারে দেবতা বলিব, সে ভরসা আজ মিছে!
সিক্ত যাদের সারা দেহ-মন মাটির মমতা-রসে
এই ধরণীর তরণীর হাল রবে তাহাদেরি বশে!
তারি পদরজ অঞ্জলি করি’ মাথায় লইব তুলি’,
সকলের সাথে পথে চলি’ যার পায়ে লাগিয়াছে ধূলি!
আজ নিখিলের বেদনা -আর্ত পীড়িতের মাখি’ খুন,
লালে লাল হ’য়ে উদিছে নবীন প্রভাতের নবারুণ!
আজ হৃদয়ের জমা-ধরা যত কবাট ভাঙিয়া দাও,
রং-করা ঐ চামড়ার যত আবরণ খুলে নাও!
আকাশের আজ যত বায়ু আছে হইয়া জমাট নীল,
মাতামাতি ক’রে ঢুকুক্‌ এ বুকে, খুলে দাও যত খিল!
সকল আকাশ ভাঙিয়া পড়-ক আমাদের এই ঘরে,
মোদের মাথায় চন্দ্র সূর্য তারারা পড়-ক ঝ’রে।
সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি’
এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশী।
একজনে দিলে ব্যথা-
সমান হইয়া বাজে সে বেদনা সকলের বুকে হেথা।
একের অসম্মান
নিখিল মানব-জাতির লজ্জা-সকলের অপমান!
মহা-মানবের মহা-বেদনার আজি মহা-উত্থান,
উর্ধ্বে হাসিছে ভগবান, নীচে কাঁপিতেছে শয়তান!

ধূমকেতু [কাজী নজরুল ইসলাম]

 

           এই     স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!
সাত      সাতশো নরক-জ্বালা জলে মম ললাটে,
মম       ধূম-কুণ্ডুলি করেছে শিবের ত্রিনয়ন ঘর ঘোলাটে!
আমি     অশিব তিক্ত অভিশাপ,
আমি     স্রষ্টার বুকে সৃষ্টি-পাপের অনুতাপ-তাপ-হাহাকার–
           আর    মর্তে সাহারা-গোবি-ছাপ,
           আমি   অশিব তিক্ত অভিশাপ!

আমি     সর্বনাশের ঝাণ্ডা উড়ায়ে বোঁও বোঁও ঘুরি শূন্যে,
আমি     বিষ-ধূম-বাণ হানি একা ঘিরে ভগবান-অভিমুন্যে।
           শোঁও    শন-নন-নন-শন-নন-নন শাঁই শাঁই,
           ঘুর্       পাক্ খাই, ধাই পাঁই পাঁই
           মম       পুচ্ছে জড়ায়ে সৃষ্টি;
           করি      উল্কা-অশনি-বৃষ্টি,–
আমি   একটা বিশ্ব গ্রাসিয়াছি, পারি গ্রাসিতে এখনো ত্রিশটি।
আমি   অপঘাত দুর্দৈব রে আমি সৃষ্টির অনাসৃষ্টি!

আমি   আপনার বিষ-জ্বালা-মদ-পিয়া মোচড় খাইয়া খাইয়া
জোর   বুঁদ হয়ে আমি চলেছি ধাইয়া ভাইয়া!
শুনি    মম বিষাক্ত 'রিরিরিরি'-নাদ
         শোনায় দ্বিরেফ-গুঞ্জন সম বিশ্ব-ঘোরার প্রণব-নিনাদ!
         ধূর্জটি-শিখ করাল পুচ্ছে
         দশ অবতারে বেঁধে ঝ্যাঁটা করে ঘুরাই উচ্চে, ঘুরাই–
আমি   অগ্নি-কেতন উড়াই!–
আমি   যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু
এই    স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!

ঐ     বামন বিধি সে আমারে ধরিতে বাড়ায়েছিল রে হাত
মম    অগ্নি-দাহনে জ্বলে পুড়ে তাই ঠুঁটো সে জগন্নাথ!
আমি   জানি জানি ঐ স্রষ্টার ফাঁকি, সৃষ্টির ঐ চাতুরী,
তাই   বিধি ও নিয়মে লাথি মেরে, ঠুকি বিধাতার বুকে হাতুড়ি।
আমি   জানি জানি ঐ ভুয়ো ঈশ্বর দিয়ে যা হয়নি হবে তাও!
তাই   বিপ্লব আনি বিদ্রোহ করি, নেচে নেচে দিই গোঁফে তাও!
তোর   নিযুত নরকে ফুঁ দিয়ে নিবাই, মৃত্যুর মুখে থুথু দি!
আর   যে যত রাগে রে তারে তত কাল্-আগুনের কাতুকুতু দি।
মম    তূরীয় লোকের তির্যক্ গতি তূর্য গাজন বাজায়
মম    বিষ নিশ্বাসে মারীভয় হানে অরাজক যত রাজায়!

কচি   শিশু-রসনায় ধানি-লঙ্কার পোড়া ঝাল
আর   বন্ধ কারায় গন্ধক ধোঁয়া, এসিড, পটাশ, মোন্‌ছাল,
আর   কাঁচা কলিজায় পচা ঘা'র সম সৃষ্টিরে আমি দাহ করি
                      আর স্রষ্টারে আমি চুষে খাই!
পেলে   বাহান্ন-শও জাহান্নমেও আধা চুমুকে সে শুষে যাই!

আমি   যুগে যুগে আসি আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু–
এই     স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!
আমি   শি শি শি প্রলয়-শিশ্ দিয়ে ঘুরি কৃতঘ্নী ঐ বিশ্বমাতার শোকাগ্নি,
আমি   ত্রিভুবন তার পোড়ায়ে মারিয়া আমিই করিব মুখাগ্নি!
তাই আমি ঘোর তিক্ত সুখে রে, একপাক ঘুরে বোঁও করে ফের দু'পাক নি!
         কৃতঘ্নী আমি কৃতঘ্নী ঐ বিশ্বমাতার শোকাগ্নি!

         পঞ্জর মম খর্পরে জ্বলে নিদারুণ যেই বৈশ্বানর–
                  শোন্ রে মর, শোন্ অমর!–
                  সে যে তোদের ঐ বিশ্বপিতার চিতা!
        এ চিতাগ্নিতে জগদীশ্বর পুড়ে ছাই হবে, হে সৃষ্টি জানো কি তা?
        কি বলো? কি বলো? ফের বলো ভাই আমি শয়তান-মিতা!
হো হো  ভগবানে আমি পোড়াব বলিয়া জ্বালায়েছি বুকে চিতা!
ছোট   শন শন শন ঘর ঘর সাঁই সাঁই!
ছোট         পাঁই পাঁই!
তুই    অভিশাপ তুই শয়তান তোর অনন্তকাল পরমাই!
ওরে   ভয় নাই তোর মার নাই!!
তুই    প্রলয়ঙ্কর ধূমকেতু,
তুই    উগ্র ক্ষিপ্ত তেজ-মরীচিকা ন'স্ অমরার ঘুম-সেতু
                    তুই     ভৈরব ভয় ধূমকেতু!
আমি    যুগে যুগে আসি আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু
এই      স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু !

ঐ       ঈশ্বর-শির উল্লজ্ঘিতে আমি আগুনের সিঁড়ি,
আমি   বসিব বলিয়া পেতেছে ভবানী ব্রহ্মার বুকে পিঁড়ি !
খ্যাপা  মহেশের বিক্ষিপ্ত পিনাক, দেবরাজ-দম্ভোলি
লোকে  বলে মোরে, শুনে হাসি আমি আর নাচি বব-বম্ বলি !
এই    শিখায় আমার নিযুত ত্রিশূল বাশুলি বজ্র-ছড়ি
ওরে   ছড়ানো রয়েছে, কত যায় গড়াগড়ি !
মহা    সিংহাসনে সে কাঁপিছে বিশ্ব-সম্রাট নিরবধি,
তার    ললাট তপ্ত অভিশাপ-ছাপ এঁকে দিই আমি যদি !
তাই   টিটকিরি দিয়ে হাহা হেসে উঠি,

আমি   বাজাই আকাশে তালি দিয়া 'তাতা-উর্-তাক্'
আর   সোঁও সোঁও করে প্যাঁচ দিয়ে খাই চিলে-ঘুড়ি সম ঘুরপাক!
মম    নিশাস আভাসে অগ্নি-গিরির বুক ফেটে ওঠে ঘুৎকার
আর   পুচ্ছে আমার কোটি নাগ-শিশু উদ্গারে বিষ-ফুৎকার!

কাল            বাঘিনী যেমন ধরিয়া শিকার
                 তখনি রক্ত শোষে না রে তার,
          দৃষ্টি-সীমায় রাখিয়া তাহারে উগ্রচণ্ড-সুখে
          পুচ্ছ সাপটি খেলা করে আর শিকার মরে সে ধুঁকে!
                 তেমনি করিয়া ভগবানে আমি
                 দৃষ্টি-সীমায় রাখি দিবাযামী
ঘিরিয়া  ঘিরিয়া খেলিতেছি খেলা, হাসি পিশাচের হাসি
         এই অগ্নি-বাঘিনী আমি যে সর্বনাশী!

আজ   রক্ত-মাতাল উল্লাসে মাতি রে–
মম    পুচ্ছে ঠিকরে দশগুণ ভাতি,
         রক্ত রুদ্র উল্লাসে মাতি রে!
ভগবান? সে তো হাতের শিকার!– মুখে ফেনা উঠে মরে!
ভয়ে   কাঁপিছে, কখন পড়ি গিয়া তার আহত বুকের 'পরে!
        অথবা যেন রে অসহায় এক শিশুরে ঘিরিয়া

অজগর কাল-কেউটে সে কোন ফিরিয়া ফিরিয়া
চায়, আর ঘোরে শন্‌ শন্ শন্,
ভয়-বিহ্বল শিশু তার মাঝে কাঁপে রে যেমন–
      তেমনি করিয়া ভগবানে ঘিরে
ধূমকেতু-কালনাগ অভিশাপ ছুটে চলেছি রে,
      আর সাপে-ঘেরা অসহায় শিশু সম
বিধাতা তাদের কাঁপিছে রুদ্র ঘূর্ণির মাঝে মম!

আজিও ব্যথিত সৃষ্টির বুকে ভগবান কাঁদে ত্রাসে,
স্রষ্টার চেয়ে সৃষ্টি পাছে বা বড় হয়ে তারে গ্রাসে!

উমর ফারুক [কাজী নজরুল ইসলাম]

             


তিমির রাত্রি - 'এশা'র আযান শুনি দূর মসজিদে।
প্রিয়-হারা কার কান্নার মতো এ-বুকে আসিয়ে বিঁধে!
                     আমির-উল-মুমেনিন,
তোমার স্মৃতি যে আযানের ধ্বনি জানে না মুয়াজ্জিন।
তকবির শুনি, শয্যা ছাড়িয়া চকিতে উঠিয়া বসি,
বাতায়নে চাই-উঠিয়াছে কি-রে গগনে মরুর শশী?
ও-আযান, ও কি পাপিয়ার ডাক, ও কি চকোরীর গান?
মুয়াজ্জিনের কন্ঠে ও কি ও তোমারি সে আহ্ববান?
                     আবার লুটায়ে পড়ি।
'সেদিন গিয়াছে' - শিয়রের কাছে কহিছে কালের ঘড়ি।
উমর! ফারুক! আখেরি নবীর ওগো দক্ষিণ-বাহু !
আহ্বান নয় - রূপ ধরে এস - গ্রাসে অন্ধতা-রাহু !
ইসলাম-রবি, জ্যোতি তার আজ দিনে দিনে বিমলিন !
সত্যের আলো  নিভিয়া-জ্বলিছে জোনাকির আলো ক্ষীণ।
শুধু অঙ্গুলি-হেলনে শাসন করিতে এ জগতের
দিয়াছিলে ফেলি মুহম্মদের চরণে যে-শমশের
ফিরদৌস ছাড়ি নেমে এস তুমি সেই শমশের ধরি
আর একবার লোহিত-সাগরে লালে-লাল হয়ে মরি !
নওশার বেশে সাজাও বন্ধু মোদের পুনর্বার
খুনের সেহেরা পরাইয়া দাও হাতে বাঁধি হাতিয়ার !
দেখাইয়া দাও - মৃত্যু যেথায় রাঙা দুলহিন - সাজে
করে প্রতীক্ষা আমাদের তরে রাঙা রণভূমি মাঝে !
মোদের ললাট - রক্তে রাঙিবে রিক্ত সিঁথি তাহার,
দুলাব তাহার গলায় মোদের লোহু - রাঙা তরবার !
                     সেনানী ! চাই হুকুম !
সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ে মৃত্যু - বধুর ঘুম
টুটিয়াছে ঐ যক্ষ - কারায় সহে না ক' আর দেরি,
নকীব কন্ঠে শুনিব কখন নব অভিযান ভেরী !
নাই তুমি নাই, তাই সয়ে যায় জামানার অভিশাপ,
তোমার তখতে বসিয়া করিছে শয়তান ইনসাফ !
মোরা "আসহাব - কাহাফে" র মতো দিবানিশা দিই ঘুম,
"এশা" র আজান কেঁদে যায় শুধু - নিঃঝুম নিঃঝুম !
                         কত কথা মনে জাগে,
চড়ি কল্পনা - বোররাকে যাই তের শ' বছর আগে
যেদিন তোমার প্রথম উদয় রাঙা মরু - ভাস্কর,
আরব যেদিন হ'ল আরাস্তা, মরীচিকা সুন্দর !
গোষ্ঠে বসিয়া বালক রাখাল মুহম্মদ সেদিন
বার বারে কেন হয়েছে উতলা ! কোথা বেহেশতী বীণ
বাজিতেছে যেন ! কে যেন আসিয়া দাঁড়িয়েছে তাঁর পিছে,
বন্ধু বলিয়া গলা জড়াইয়া কে যেন সম্ভাষিছে !
                       মানসে ভাসিছে ছবি -
হয়ত সেদিন বাজাইয়া বেনু মোদের বালক নবী
অকারণ সুখে নাচিয়া ফিরেছে মেষ - চারণের মাঠে !
খেলায়েছে খেলা বাজাইয়া বাঁশি মক্কার মরু - বাটে !
খাইয়াছে চুমা দুম্বা - শিশুরে জড়াইয়া ধরি' বুকে,
উড়ায়ে দিয়েছে কবুতর গুলি আকাশে অজানা সুখে !
সূর্য যেন গো দেখিয়াছে - তার পিছনের অমারাতি
রৌশন - রাঙা করিছে কে যেন জ্বালায়ে চাঁদের বাতি।
উঠেছিল রবি আমাদের নবী, সে মহা সৌরলোকে,
উমর, একাকী তুমি পেয়েছিলে সে আলো তোমার চোখে !
কে বুঝিবে লিলা - রসিকের খেলা ! বুঝি ইঙ্গিতে তার
বেহেশত - সাথী খেলিতে আসিলে ধরায় পুনর্বার।
তোমার রাখাল - দোস্তের মেষ চরিত সুদূর গোঠে,
হেথা "আজনান" - ময়দানে তব পরান ব্যথিয়া ওঠে !
কেন কার তরে এ প্রাণ - পোড়ানি নিজেই জাননা বুঝি,
তোমার মাঠের উটেরা হারায়, তুমি তা দেখনা খুঁজি !
ইহারই মাঝে বা হয়ত কখন দুঁহুঁ দোঁহা দেখেছিলে,
খেজুর - মোতির গল - হার যেন বদল করিয়া নিলে,
হইলে বন্ধু মেষ - চারণের ময়দানে নিরালায়,
চকিত দেখায় চিনিল হৃদয় চির - চেনা আপনায় !
খেলার প্রভাত কাটিল কখন, ক্রমে বেলা বেড়ে চলে,
প্রভাতের মালা শুকায়ে ঝরিল খর মরু - বালুতলে।
দীপ্ত জীবন - মধ্যাহ্নের রৌদ্র - তপ্ত পথে
প্রভাতের সখা শত্রুর বেশে আসিলে রক্ত - রথে।
আরবে সেদিন ডাকিয়াছে বান, সেদিন ভুবন জুড়ি,
"হেরা" - গুহা হ'তে ঠিকরিয়া ছুটি মহাজ্যোতি বিচ্ছুরি' !
প্রতীক্ষমাণ তাপসী ধরণী সেদিন শুদ্ধস্নাতা
উদাত্ত স্বরে গাহিতেছিল গো কোরানের সম - গাথা !
পাষাণের তলে ছিল এত জল, মরুভূমে এত ঢল ?
সপ্ত সাগর সাত শত হ'য়ে করে যেন টলমল !
খোদার হাবিব এসেছে আজিকে হইয়া মানব - মিতা,
পুণ্য - প্রভায় ঝলমল করে ধরা পাপ - শঙ্কিতা।
সেদিন পাথারে উঠিল যে মৌজ তাহারে শাসন - হেতু
নির্ভিক যুবা দাঁড়াইলে আসি ধিরি' বিদ্রোহ - কেতু !
উদ্ধত রোষে তরবারি তব উর্ধ্বে আন্দোলিয়া
বলিলে, "রাঙ্গাবে এ তেগ মুসলমানের রক্ত দিয়া !"
উন্মাদ বেগে চলিলে ছুটিয়া ! - একি একি ওঠে গান ?
এ কোন লোকের অমৃত মন্ত্র ? কার মহা আহ্বান ?
ফাতেমা - তোমার সহোদরা - গাহে কোরান - অমিয় - গাথা,
এ কোন মন্ত্রে চোখে আসে জল, হায় তুমি জান না তা' !
উন্মাদ - সম কেঁদে কও, "ওরে, শোনা পুনঃ সেই বাণী !
কে শিখাল তোরে এ গান সে কোন বেহেশত হ'তে আনি'
এ কি হল মোর ? অভিনব এই গীতি শুনি' হায় কেন
সকল অঙ্গ শিথিল হইয়া আসিছে আবেশ যেন !
কি যেন পুলক কি যেন আবেগে কেঁপে উঠি বারে বারে,
মানুষের দুখে এমন করিয়া কে কাঁদিছে কোন পারে ? 
"আশহাদু আল - লা - ইলাহা ইল্লাল্লাহু" বলি'
কহিল ফাতেমা - "এই সে কোরান, খোদার কালাম গলি',
নেমেছে ভুবনে মুহম্মদের অমর কন্ঠে ভাই !
এই ইসলাম, আমরা ইহারি বন্যায় ভেসে যাই !"
উমর আনিল ঈমান। -গরজি' গরজি' উঠিল স্বর
গগণ পবন মন্থন করি' - "আল্লাহু আকবর !"
সম্ভ্রমে-নত বিশ্ব সেদিন গাহিল তোমার স্তব -
"এসেছেন নবী, এত দিনে এল ধরায় মহামানব !"
পয়গম্বর নবী ও রসুল - এঁরা তো খোদার দান !
তুমি রাখিয়াছ, হে অতি - মানুষ, মানুষের সম্মান !
কোরান এনেছে সত্যের বানী, সত্য দিয়াছে প্রাণ,
তুমি রূপ - তব মাঝে সে সত্য হয়েছে অধিষ্ঠান।
ইসলাম দিল কি দান বেদনা - পীড়িত এ ধরনীরে,
কোন নব বানী শুনাইতে খোদা পাঠাইলো শেষ নবীরে, -
তোমারে হেরিয়া পেয়েছি জওয়াব সে সব জিজ্ঞাসার।
কী যে ইসলাম, হয়ত বুঝিনি, এইটুকু বুঝি তার
উমর সৃজিতে পারে যে ধর্ম, আছে তার প্রয়োজন !
ওগো, মানুষের কল্যাণ লাগি' তারি শুভ আগমন
প্রতীক্ষায় এ দুঃখিনী ধরা জাগিয়াছে নিশিদিন
জরা - জর্জর সন্তানে ধরি' বক্ষে শান্তিহীন !
                      তপস্বিনীর মত
তাহারি আশায় সেধেছে ধরনী অশেষ দুখের ব্রত।
ইসলাম - সে তো পরশ-মানিক তাকে কে পেয়েছে খুঁজি?
পরশে তাহার সোনা হল যারা তাদেরেই মোরা বুঝি।
আজ বুঝি - কেন বলিয়াছিলেন শেষ পয়গম্বর-
'মোরপরে যদি নবী হত কেউ, হত সে এক উমর।'
পাওনি ক' "ওহি", হওনি ক' নবী, তাই তো পরান ভরি'
বন্ধু ডাকিয়া আপনার বলি বক্ষে' জড়ায়ে ধরি !
খোদারে আমরা করি গো সিজদা, রসূলে করি সালাম,
ওঁরা উর্ধ্বের, পবিত্র হয়ে নিই তাঁহাদের নাম।
তোমারে স্মরিতে ঠেকাই না কর ললাটে ও চোখে - মুখে,
প্রিয় হয়ে তুমি আছ হতমান মানুষ জাতির বুকে।
করেছ শাসন অপরাধীদের তুমি করনি ক' ক্ষমা,
করেছ বিনাশ অসুন্দরের। বলনি ক' মনোরমা
মিথ্যাময়ীরে। বাঁধনি ক' বাসা মাটির উর্ধ্বে উঠি।
তুমি খাইয়াছ দুঃখীর সাথে ভিক্ষার ক্ষুদ খুঁটি !
অর্ধ পৃথিবী করেছ শাসন ধুলার তখতে বসি
খেজুরপাতার প্রাসাদ তোমার বারে বারে গেছে খসি
সাইমুম-ঝড়ে। পড়েছে কুটির, তুমি পড়নি ক' নুয়ে,
ঊর্ধ্বের যারা - পড়ছে তাহারা, তুমি ছিলে খাড়া ভূঁয়ে।
শত প্রলোভন বিলাস বাসনা ঐশ্বর্যের মদ
করেছে সালাম দূর হতে সব ছুঁইতে পারেনি পদ।
সবারে ঊর্ধ্বে তুলিয়া ধরিয়া তুমি ছিলে সব নিচে,
বুকে করে সবে বেড়া করি পার, আপনি রহিলে পিছে।
                     হেরি পশ্চাতে চাহি-
তুমি চলিয়াছ রৌদ্রদগ্ধ দূর মরুপথ বাহি
জেরুজালেমের কিল্লা যথায় আছে অবরোধ করি
বীর মুসলিম সেনাদল তব বহু দিন মাস ধরি।
দুর্গের দ্বার খুলিবে তাহারা বলেছে শত্রু শেষে-
উমর যদি গো সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করে এসে!
হায় রে, আধেক ধরার মালিক আমির-উল-মুমেনিন
শুনে সে খবর একাকী উষ্ট্রে চলেছে বিরামহীন
সাহারা পারায়ে! ঝুলিতে দু খানা শুকনো 'খবুজ' রুটি
একটি  মশকে একটুকু পানি খোর্মা দু তিন মুঠি।
প্রহরীবিহীন সম্রাট চলে একা পথে উটে চড়ি
চলেছে একটি মাত্র ভৃত্য উষ্ট্রের রশি ধরি!
মরুর সূর্য ঊর্ধ্ব আকাশে আগুন বৃষ্টি করে,
সে আগুন-তাতে খই সম ফোটে বালুকা মরুর পরে।
কিছুদূর যেতে উঠ হতে নামি কহিলে ভৃত্যে, 'ভাই
পেরেশান বড় হয়েছ চলিয়া! এইবার আমি যাই
উষ্ট্রের রশি ধরিয়া অগ্রে, তুমি উঠে বস উটে,
তপ্ত বালুতে চলি যে চরণে রক্ত উঠেছে ফুটে।'
                     ...ভৃত্য দস্ত চুমি
কাঁদিয়া কহিল, 'উমর! কেমনে এ আদেশ কর তুমি?
উষ্ট্রের পিঠে আরাম করিয়া গোলাম রহিবে বসি
আর হেঁটে যাবে খলিফা উমর ধরি সে উটের রশি?'
                     খলিফা হাসিয়া বলে,
'তুমি জিতে গিয়ে বড় হতে চাও, ভাই রে, এমনি ছলে।
রোজ-কিয়ামতে আল্লাহ যে দিন কহিবে, 'উমর! ওরে
করেনি খলিফা, মুসলিম-জাঁহা তোর সুখ তরে তোরে।'
কি দিব জওয়াব, কি করিয়া মুখ দেখাব রসুলে ভাই।
আমি তোমাদের প্রতিনিধি শুধু, মোর অধিকার নাই।
আরাম সুখের, - মানুষ হইয়া নিতে মানুষের সেবা।
ইসলাম বলে, সকলে সমান, কে বড় ক্ষুদ্র কেবা।
ভৃত্য চড়িল উটের পৃষ্ঠে উমর ধরিল রশি,
মানুষে স্বর্গে তুলিয়া ধরিয়া ধুলায় নামিল শশী।
জানি না, সেদিন আকাশে পুষ্প বৃষ্টি হইল কিনা,
কি গান গাহিল মানুষে সেদিন বন্দী' বিশ্ববীণা।
জানি না, সেদিন ফেরেশতা তব করেছে কি না স্তব-
অনাগত কাল গেয়েছিল শুধু, 'জয় জয়  হে মানব।'
আসিলে প্যালেস্টাইন, পারায়ে দুস্তর মরুভূমি,
ভৃত্য তখন উটের উপরে, রশি ধ'রে চল তুমি !
জর্ডান নদী হও যবে পার, শত্রুরা কহে হাঁকি -
"যার নামে কাঁপে অর্ধ পৃথিবী, এই সে উমর নাকি ?"
খুলিল রুদ্ধ দুর্গ - দুয়ার ! শত্রুরা সম্ভ্রমে
কহিল - "খলিফা আসেনি, এসেছে মানুষ জেরুজালেমে !"
সন্ধিপত্র স্বাক্ষর করি' শত্রু - গির্জা - ঘরে
বলিলে, "বাহিরে যাইতে হইবে এবার নামাজ তরে !"
কহে পুরোহিত, "আমাদের এই আঙ্গিনায় গির্জায়,
পড়িলে নামাজ হবে না কবুল আল্লার দরগায় ?"
হাসিয়া বলিলে, "তার তরে নয়, আমি যদি হেথা আজ
নামাজ আদায় করি, তবে কাল অন্ধ লোক সমাজ
ভাবিবে - খলিফা করিছে ইশারা হেথায় নামাজ পড়ি'
আজ হতে যেন এই গির্জারে মোরা মসজিদ করি !
ইসলামের এ নহে ক' ধর্ম, নহে খোদার বিধান,
কারো মন্দির গির্জারে করে ম'জিদ মুসলমান !"
কেঁদে কহে যত ঈসাই ইহুদী অশ্রু - সিক্ত আঁখি -
"এই যদি হয় ইসলাম - তবে কেহ রহিবে না বাকি,
                         সকলে আসিবে ফিরে
গনতন্ত্রের ন্যায় সাম্যের শুভ্র এ মন্দিরে !"
তুমি নির্ভীক, এক খোদা ছাড়া করনি ক' কারে ভয়,
সত্যব্রত তোমায় তাইতে সবে উদ্ধত কয়।
মানুষ হইয়া মানুষের পূজা মানুষেরি অপমান,
তাই মহাবীর খালিদেরে তুমি পাঠাইলে ফরমান,
সিপাহ-সালারে ইঙ্গিতে তব করিলে মামুলি সেনা,
বিশ্ব-বিজয়ী বীরেরে শাসিতে এতটুকু টলিলে না।
ধরাধাম ছাড়ি' শেষ নবী যবে করিল মহাপ্রয়াণ,
কে হবে খলিফা - হয়নি তখনো কলহের অবসান,
নবী - নন্দিনী বিবি ফাতেমার মহলে আসিয়া সবে
করিতে লাগিল জটলা - ইহার পরে কে খলিফা হবে।
বজ্রকন্ঠে তুমিই সেদিন বলিতে পারিয়াছিলে -
"নবীসূতা ! তব মহল জ্বালাব, এ সভা ভেঙ্গে না দিলে।"
মানব-প্রেমিক! আজিকে তোমারে স্মরি,
মনে পড়ে তব মহত্ত্ব-কথা - সেদিন সে বিভাবরী
নগর-ভ্রমণে বাহিরিয়া তুমি দেখিতে পাইলে দূরে
মায়েরে ঘিরিয়া ক্ষুদাতুর দুটি শিশু সকরুণ সুরে
কাঁদিতেছে আর দুখিনী মাতা ছেলেরে ভুলাতে হায়,
উনানে শূন্য হাঁড়ি চড়াইয়া কাঁদিয়া অকুলে চায়।
শুনিয়া সকলি - কাঁদিতে কাঁদিতে ছুটে গেলে মদিনাতে
বায়তুল-মাল হইতে লইয়া ঘৃত আটা নিজ হাতে,
বলিলে, 'এসব চাপাইয়া দাও আমার পিঠের 'পরে,
আমি লয়ে যাব বহিয়া এ-সব দুখিনী মায়ের ঘরে'।
কত লোক আসি আপনি চাহিল বহিতে তোমার বোঝা,
বলিলে, 'বন্ধু, আমার এ ভার আমিই বহিব সোজা !
রোজ-কিয়ামতে কে বহিবে বল আমার পাপের ভার?
মম অপরাধে ক্ষুধায় শিশুরা কাঁদিয়াছে, আজি তার
প্রায়শ্চিত্ত করিব আপনি' - চলিলে নিশীথ রাতে
পৃষ্ঠে বহিয়া খাদ্যের বোঝা দুখিনীর আঙিনাতে !
                     এত যে কোমল প্রাণ,
করুণার বশে তবু গো ন্যায়ের করনি ক' অপমান !
মদ্যপানের অপরাধে প্রিয় পুত্রেরে নিজ করে
মেরেছ দোররা, মরেছে পুত্রে তোমার চোখের পরে!
ক্ষমা চাহিয়াছে পুত্র, বলেছ পাষাণে বক্ষ বাঁধি-
'অপরাধ করে তোরি মতো স্বরে কাঁদিয়াছে অপরাধী।'
                     আবু শাহমার গোরে
কাঁদিতে যাইয়া ফিরিয়া আসি গো তোমারে সালাম করে।
খাস দরবার ভরিয়া গিয়াছে হাজার দেশের লোকে,
'কোথায় খলিফা' কেবলি প্রশ্ন ভাসে উৎসুক চোখে,
একটি মাত্র পিরান কাচিয়া শুকায়নি তাহা বলে,
রৌদ্রে ধরিয়া বসিয়া আছে গো খলিফা আঙিনা-তলে।
হে খলিফাতুল-মুসলেমিন! হে চীরধারী সম্রাট!
অপমান তব করিব না আজ করিয়া  নান্দী পাঠ,
মানুষেরে তুমি বলেছ বন্ধু, বলিয়াছ ভাই, তাই
তোমারে এমন চোখের পানিতে স্মরি গো সর্বদাই।
বন্ধু গো, প্রিয়, এ হাত তোমারে সালাম করিতে গিয়া
ওঠে না উর্ধ্বে, বক্ষে তোমারে ধরে শুধু জড়াইয়া !
                             মাহিনা মোহররম -
হাসান, হোসেন হয়েছে শহীদ, জানে শুধু হায় কৌম,
শহীদি বাদশা' ! মোহররমে যে তুমিও গিয়েছ চলি'
খুনের দরিয়া সাঁতারি' - এ জাতি গিয়াছে গো তাহা ভুলি' !
মোরা ভুলিয়াছি, তুমি ত ভোলনি ! আজো আজানের মাঝে
মুয়াজ্জিনের কন্ঠে বন্ধু তোমারি কাঁদন বাজে।
বন্ধু গো জানি, আমাদের প্রেমে আজো ও গোরের বুকে
তেমনি করিয়া কাঁদিছ হয়ত কত না গভীর দুখে।
ফিরদৌস হ'তে ডাকিছে বৃথাই নবী পয়গম্বর,
মাটির দুলাল মানুষের সাথে ঘুমাও মাটির 'পর।
হে শহীদ ! বীর ! এই দোয়া কর আরশের পায়া ধরি' -
তোমারি মতন মরি যেন হেসে খুনের সেহেরা পরি' !
মৃত্যুর হাতে মরিতে চাহিনা, মানুষের প্রিয় করে
আঘাত খাইয়া যেন গো আমার শেষ নিঃশ্বাস পড়ে !

দুই বিঘা জমি [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]

 


শুধু বিঘে-দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবই গেছে ঋণে।
বাবু বলিলেন, 'বুঝেছ উপেন? এ জমি লইব কিনে।'
কহিলাম আমি, 'তুমি ভূস্বামী, ভূমির অন্ত নাই -
চেয়ে দেখো মোর আছে বড়জোর মরিবার মতো ঠাঁই।
শুনি রাজা কহে, 'বাপু, জানো তো হে, করেছি বাগানখানা,
পেলে দুই বিঘে প্রস্থে ও দিঘে সমান হইবে টানা -
ওটা দিতে হবে।' কহিলাম তবে বক্ষে জুড়িয়া পাণি
সজল চক্ষে, 'করুন রক্ষে গরিবের ভিটেখানি।
সপ্তপুরুষ যেথায় মানুষ সে মাটি সোনার বাড়া,
দৈন্যের দায়ে বেচিব সে মায়ে এমনি লক্ষ্মীছাড়া!'
আঁখি করি লাল রাজা ক্ষণকাল রহিল মৌনভাবে,
কহিলেন শেষে ক্রুর হাসি হেসে, 'আচ্ছা, সে দেখা যাবে।'

পরে মাস-দেড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে বাহির হইনু পথে -
করিল ডিক্রি, সকলই বিক্রি মিথ্যা দেনার খতে।
এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি,
রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।
মনে ভাবিলাম, মোরে ভগবান রাখিবে না মোহগর্তে,
তাই লিখি দিল বিশ্বনিখিল দু বিঘার পরিবর্তে।
সন্ন্যাসীবেশে ফিরি দেশে দেশে হইয়া সাধুর শিষ্য -
কত হেরিলাম মনোহর ধাম, কত মনোরম দৃশ্য।
ভূধরে সাগরে বিজনে নগরে যখন যেখানে ভ্রমি
তবু নিশিদিনে ভুলিতে পারি নে সেই দুই বিঘা জমি।
হাটে মাঠে বাটে এইমত কাটে বছর পনেরো-ষোলো,
একদিন শেষে ফিরিবারে দেশে বড়োই বাসনা হল।।

নমোনমো নম, সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি!
গঙ্গার তীর, স্নিগ্ধ সমীর জীবন জুড়ালে তুমি।
অবারিত মাঠ, গগনললাট চুমে তব পদধুলি -
ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলি।
পল্লবঘন আম্রকানন, রাখালের খেলাগেহ -
স্তব্ধ অতল দিঘি কালোজল নিশীথশীতলস্নেহ।
বুক-ভরা-মধু বঙ্গের বধু জল লয়ে যায় ঘরে
মা বলিতে প্রাণ করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে।
দুই দিন পরে দ্বিতীয় প্রহরে প্রবেশিনু নিজগ্রামে -
কুমোরের বাড়ি দক্ষিণে ছাড়ি, রথতলা করি বামে,
রাখি হাটখোলা নন্দীর গোলা, মন্দির করি পাছে
তৃষাতুর শেষে পঁহুছিনু এসে আমার বাড়ির কাছে।।

ধিক্ ধিক্ ওরে, শত ধিক্ তোরে নিলাজ কুলটা ভূমি,
যখনি যাহার তখনি তাহার - এই কি জননী তুমি!
সে কি মনে হবে একদিন যবে ছিলে দরিদ্রমাতা
আঁচল ভরিয়া রাখিতে ধরিয়া ফলফুল শাক-পাতা!
আজ কোন্ রীতে কারে ভুলাইতে ধরেছ বিলাসবেশ -
পাঁচরঙা পাতা অঞ্চলে গাঁথা, পুষ্পে খচিত কেশ!
আমি তোর লাগি ফিরেছি বিবাগি গৃহহারা সুখহীন,
তুই হেথা বসি ওরে রাক্ষসী, হাসিয়া কাটাস দিন!
ধনীর আদরে গরব না ধরে! এতই হয়েছ ভিন্ন -
কোনোখানে লেশ নাহি অবশেষ সে দিনের কোনো চিহ্ন!
কল্যাণময়ী ছিলে তুমি অয়ী, ক্ষুধাহরা সুধারাশি।
যত হাসো আজ, যত করো সাজ, ছিলে দেবী - হলে দাসী।।

বিদীর্ণহিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া চারি দিকে চেয়ে দেখি -
প্রাচীরের কাছে এখনো যে আছে সেই আমগাছ একি!
বসি তার তলে নয়নের জলে শান্ত হইল ব্যথা,
একে একে মনে উদিল স্মরণে বালককালের কথা।
সেই মনে পড়ে, জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিকো ঘুম,
অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম।
সেই সুমধুর স্তব্ধ দুপুর, পাঠশালা-পলায়ন -
ভাবিলাম হায়, আর কি কোথায় ফিরে পাব সে জীবন।
সহসা বাতাস ফেলি গেল শ্বাস শাখা দুলাইয়া গাছে,
দুটি পাকা ফল লভিল ভূতল আমার কোলের কাছে।
ভাবিলাম মনে, বুঝি এতখনে আমারে চিনিল মাতা।
স্নেহের সে দানে বহু সম্মানে বারেক ঠেকানু মাথা।।

হেনকালে হায় যমদূতপ্রায় কোথা হতে এল মালী।
ঝুঁটিবাঁধা উড়ে সপ্তম সুরে পাড়িতে লাগিল গালি।
কহিলাম তবে, 'আমি তো নীরবে দিয়েছি আমার সব -
দুটি ফল তার করি অধিকার, এত তারি কলরব।'
চিনিল না মোরে, নিয়ে গেল ধরে কাঁধে তুলি লাঠিগাছ;
বাবু ছিপ হাতে পারিষদ-সাথে ধরিতেছিলেন মাছ -
শুনে বিবরণ ক্রোধে তিনি কন, 'মারিয়া করিব খুন।'
বাবু যত বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ।
আমি কহিলাম, 'শুধু দুটি আম ভিখ মাগি মহাশয়!'
বাবু কহে হেসে, 'বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়!'
আমি শুনে হাসি, আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোরে ঘটে -
তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।।