রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর, ২০২৫

দুই বিঘা জমি [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]

 


শুধু বিঘে-দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবই গেছে ঋণে।
বাবু বলিলেন, 'বুঝেছ উপেন? এ জমি লইব কিনে।'
কহিলাম আমি, 'তুমি ভূস্বামী, ভূমির অন্ত নাই -
চেয়ে দেখো মোর আছে বড়জোর মরিবার মতো ঠাঁই।
শুনি রাজা কহে, 'বাপু, জানো তো হে, করেছি বাগানখানা,
পেলে দুই বিঘে প্রস্থে ও দিঘে সমান হইবে টানা -
ওটা দিতে হবে।' কহিলাম তবে বক্ষে জুড়িয়া পাণি
সজল চক্ষে, 'করুন রক্ষে গরিবের ভিটেখানি।
সপ্তপুরুষ যেথায় মানুষ সে মাটি সোনার বাড়া,
দৈন্যের দায়ে বেচিব সে মায়ে এমনি লক্ষ্মীছাড়া!'
আঁখি করি লাল রাজা ক্ষণকাল রহিল মৌনভাবে,
কহিলেন শেষে ক্রুর হাসি হেসে, 'আচ্ছা, সে দেখা যাবে।'

পরে মাস-দেড়ে ভিটে মাটি ছেড়ে বাহির হইনু পথে -
করিল ডিক্রি, সকলই বিক্রি মিথ্যা দেনার খতে।
এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি,
রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।
মনে ভাবিলাম, মোরে ভগবান রাখিবে না মোহগর্তে,
তাই লিখি দিল বিশ্বনিখিল দু বিঘার পরিবর্তে।
সন্ন্যাসীবেশে ফিরি দেশে দেশে হইয়া সাধুর শিষ্য -
কত হেরিলাম মনোহর ধাম, কত মনোরম দৃশ্য।
ভূধরে সাগরে বিজনে নগরে যখন যেখানে ভ্রমি
তবু নিশিদিনে ভুলিতে পারি নে সেই দুই বিঘা জমি।
হাটে মাঠে বাটে এইমত কাটে বছর পনেরো-ষোলো,
একদিন শেষে ফিরিবারে দেশে বড়োই বাসনা হল।।

নমোনমো নম, সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি!
গঙ্গার তীর, স্নিগ্ধ সমীর জীবন জুড়ালে তুমি।
অবারিত মাঠ, গগনললাট চুমে তব পদধুলি -
ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছোটো ছোটো গ্রামগুলি।
পল্লবঘন আম্রকানন, রাখালের খেলাগেহ -
স্তব্ধ অতল দিঘি কালোজল নিশীথশীতলস্নেহ।
বুক-ভরা-মধু বঙ্গের বধু জল লয়ে যায় ঘরে
মা বলিতে প্রাণ করে আনচান, চোখে আসে জল ভরে।
দুই দিন পরে দ্বিতীয় প্রহরে প্রবেশিনু নিজগ্রামে -
কুমোরের বাড়ি দক্ষিণে ছাড়ি, রথতলা করি বামে,
রাখি হাটখোলা নন্দীর গোলা, মন্দির করি পাছে
তৃষাতুর শেষে পঁহুছিনু এসে আমার বাড়ির কাছে।।

ধিক্ ধিক্ ওরে, শত ধিক্ তোরে নিলাজ কুলটা ভূমি,
যখনি যাহার তখনি তাহার - এই কি জননী তুমি!
সে কি মনে হবে একদিন যবে ছিলে দরিদ্রমাতা
আঁচল ভরিয়া রাখিতে ধরিয়া ফলফুল শাক-পাতা!
আজ কোন্ রীতে কারে ভুলাইতে ধরেছ বিলাসবেশ -
পাঁচরঙা পাতা অঞ্চলে গাঁথা, পুষ্পে খচিত কেশ!
আমি তোর লাগি ফিরেছি বিবাগি গৃহহারা সুখহীন,
তুই হেথা বসি ওরে রাক্ষসী, হাসিয়া কাটাস দিন!
ধনীর আদরে গরব না ধরে! এতই হয়েছ ভিন্ন -
কোনোখানে লেশ নাহি অবশেষ সে দিনের কোনো চিহ্ন!
কল্যাণময়ী ছিলে তুমি অয়ী, ক্ষুধাহরা সুধারাশি।
যত হাসো আজ, যত করো সাজ, ছিলে দেবী - হলে দাসী।।

বিদীর্ণহিয়া ফিরিয়া ফিরিয়া চারি দিকে চেয়ে দেখি -
প্রাচীরের কাছে এখনো যে আছে সেই আমগাছ একি!
বসি তার তলে নয়নের জলে শান্ত হইল ব্যথা,
একে একে মনে উদিল স্মরণে বালককালের কথা।
সেই মনে পড়ে, জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিকো ঘুম,
অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম।
সেই সুমধুর স্তব্ধ দুপুর, পাঠশালা-পলায়ন -
ভাবিলাম হায়, আর কি কোথায় ফিরে পাব সে জীবন।
সহসা বাতাস ফেলি গেল শ্বাস শাখা দুলাইয়া গাছে,
দুটি পাকা ফল লভিল ভূতল আমার কোলের কাছে।
ভাবিলাম মনে, বুঝি এতখনে আমারে চিনিল মাতা।
স্নেহের সে দানে বহু সম্মানে বারেক ঠেকানু মাথা।।

হেনকালে হায় যমদূতপ্রায় কোথা হতে এল মালী।
ঝুঁটিবাঁধা উড়ে সপ্তম সুরে পাড়িতে লাগিল গালি।
কহিলাম তবে, 'আমি তো নীরবে দিয়েছি আমার সব -
দুটি ফল তার করি অধিকার, এত তারি কলরব।'
চিনিল না মোরে, নিয়ে গেল ধরে কাঁধে তুলি লাঠিগাছ;
বাবু ছিপ হাতে পারিষদ-সাথে ধরিতেছিলেন মাছ -
শুনে বিবরণ ক্রোধে তিনি কন, 'মারিয়া করিব খুন।'
বাবু যত বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ।
আমি কহিলাম, 'শুধু দুটি আম ভিখ মাগি মহাশয়!'
বাবু কহে হেসে, 'বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়!'
আমি শুনে হাসি, আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোরে ঘটে -
তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।।

শনিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

অকর্মার বিভ্রাট [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]



লাঙল কাঁদিয়া বলে ছাড়ি দিয়ে গলা,
তুই কোথা হতে এলি ওরে ভাই ফলা?
যেদিন আমার সাথে তোরে দিল জুড়ি
সেই দিন হতে মোর মাথা-খোঁড়াখুঁড়ি।
ফলা কহে, ভালো ভাই, আমি যাই খসে,
দেখি তুমি কী আরামে থাক ঘরে ব’সে।
ফলাখানা টুটে গেল, হল্‌খানা তাই
খুশি হয়ে পড়ে থাকে, কোনো কর্ম নাই।
চাষা বলে, এ আপদ আর কেন রাখা,
এরে আজ চালা করে ধরাইব আখা।
হল্‌ বলে, ওরে ফলা, আয় ভাই ধেয়ে—
খাটুনি যে ভালো ছিল জ্বলুনির চেয়ে।

নূতন চাল [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]


এক দিন গরজিয়া কহিল মহিষ,
ঘোড়ার মতন মোর থাকিবে সহিস।
একেবারে ছাড়িয়াছি মহিষি-চলন,
দুই বেলা চাই মোর দলন-মলন।
এই ভাবে প্রতিদিন, রজনী পোহালে,
বিপরীত দাপাদাপি করে সে গোহালে।
প্রভু কহে,চাই বটে! ভালো, তাই হোক!
পশ্চাতে রাখিল তার দশ জন লোক।
দুটো দিন না যাইতে কেঁদে কয় মোষ,
আর কাজ নেই প্রভু, হয়েছে সন্তোষ।
সহিসের হাত হতে দাও অব্যাহতি,
দলন-মলনটার বাড়াবাড়ি অতি।


বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০১৯

সোনার তরী [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]


গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
     কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।
            রাশি রাশি ভারা ভারা
            ধান কাটা হল সারা,
            ভরা নদী ক্ষুরধারা
                    খরপরশা।
     কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।
     একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা,
     চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
            পরপারে দেখি আঁকা
            তরুছায়ামসীমাখা
            গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
                    প্রভাতবেলা--
     এ পারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা।
     গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে,
     দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।
            ভরা-পালে চলে যায়,
            কোনো দিকে নাহি চায়,
            ঢেউগুলি নিরুপায়
                    ভাঙে দু-ধারে--
     দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।
ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্‌ বিদেশে,
     বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে।
            যেয়ো যেথা যেতে চাও,
            যারে খুশি তারে দাও,
            শুধু তুমি নিয়ে যাও
                    ক্ষণিক হেসে
     আমার সোনার ধান কূলেতে এসে।
     যত চাও তত লও তরণী-'পরে।
     আর আছে?-- আর নাই, দিয়েছি ভরে।
            এতকাল নদীকূলে
            যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
            সকলি দিলাম তুলে
                    থরে বিথরে--
     এখন আমারে লহ করুণা করে।
     ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই-- ছোটো সে তরী
     আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
            শ্রাবণগগন ঘিরে
            ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
            শূন্য নদীর তীরে
                    রহিনু পড়ি--
     যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।


  ফাল্গুন  ১২৯৮  শিলাইদহ।  বোট

সুপ্তোত্থিতা [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]


 ঘুমের দেশে ভাঙিল ঘুম,
             উঠিল কলস্বর।
        গাছের শাখে জাগিল পাখি
             কুসুমে মধুকর।
        অশ্বশালে জাগিল ঘোড়া,
            হস্তিশালে হাতি।
        মল্লশালে মল্ল জাগি
            ফুলায় পুন ছাতি।
        জাগিল পথে প্রহরিদল,
            দুয়ারে জাগে দ্বারী।
        আকাশে চেয়ে নিরখে বেলা
             জাগিয়া নরনারী।
        উঠিল জাগি রাজাধিরাজ,
            জাগিল রানীমাতা।
        কচালি আঁখি কুমার-সাথে
            জাগিল রাজভ্রাতা।
        নিভৃত ঘরে ধূপের বাস,
            রতন-দীপ জ্বালা,
        জাগিয়া উঠি শয্যাতলে
           শুধাল রাজবালা--
                কে পরালে মালা!
        খসিয়া-পড়া আঁচলখানি
            বক্ষে তুলি দিল।
        আপন-পানে নেহারি চেয়ে
            শরমে শিহরিল।
        ত্রস্ত হয়ে চকিত চোখে
            চাহিল চারিদিকে,
        বিজন গৃহ, রতন-দীপ
            জ্বলিছে অনিমিখে।
        গলার মালা খুলিয়া লয়ে
            ধরিয়া দুটি করে
        সোনার সুতে যতনে গাঁথা
            লিখনখানি পড়ে।
        পড়িল নাম, পড়িল ধাম,
            পড়িল লিপি তার,
        কোলের 'পরে বিছায়ে দিয়ে
            পড়িল শতবার।
        শয়নশেষে রহিল বসে,
            ভাবিল রাজবালা--
        আপন ঘরে ঘুমায়েছিনু
            নিতান্ত নিরালা--
                  কে পরালে মালা!
        নূতন-জাগা কুঞ্জবনে
            কুহরি উঠে পিক,
        বসন্তের চুম্বনেতে
            বিবশ দশ দিক।
       বাতাস ঘরে প্রবেশ করে
            ব্যাকুল উচ্ছ্বাসে,
        নবীন ফুলমঞ্জরির
            গন্ধ লয়ে আসে।
        জাগিয়া উঠি বৈতালিক
            গাহিছে জয়গান,
        প্রাসাদদ্বারে ললিত স্বরে
            বাঁশিতে উঠে তান।
        শীতলছায়া নদীর পথে
            কলসে লয়ে বারি--
        কাঁকন বাজে, নূপুর বাজে--
            চলিছে পুরনারী।
        কাননপথে মর্মরিয়া
            কাঁপিছে গাছপালা,
        আধেক মুদি নয়ন দুটি
             ভাবিছে রাজবালা--
                 কে পরালে মালা!
        বারেক মালা গলায় পরে,
             বারেক লহে খুলি,
        দুইটি করে চাপিয়া ধরে
             বুকের কাছে তুলি।
        শয়ন'পরে মেলায়ে দিয়ে
             তৃষিত চেয়ে রয়,
        এমনি করে পাইবে যেন
             অধিক পরিচয়।
        জগতে আজ কত-না ধ্বনি
             উঠিছে কত ছলে--
        একটি আছে গোপন কথা,
              সে কেহ নাহি বলে।
        বাতাস শুধু কানের কাছে
               বহিয়া যায় হূহু,
        কোকিল শুধু অবিশ্রাম
               ডাকিছে কুহু কুহু।
        নিভৃত ঘরে পরান-মন
               একান্ত উতালা,
        শয়নশেষে নীরবে বসে
               ভাবিছে রাজবালা--
                    কে পরালে মালা!
        কেমন বীর-মুরতি তার
             মাধুরী দিয়ে মিশা।
        দীপ্তিভরা নয়নমাঝে
             তৃপ্তিহীন তৃষা।
        স্বপ্নে তারে দেখেছে যেন
            এমনি মনে লয়--
        ভুলিয়া গেছে, রয়েছে শুধু
             অসীম বিস্ময়।
        পারশে যেন বসিয়াছিল,
             ধরিয়াছিল কর,
        এখনো তার পরশে যেন
             সরস কলেবর।
        চমকি মুখ দু-হাতে ঢাকে,
             শরমে টুটে মন,
        লজ্জাহীন প্রদীপ কেন
             নিভে নি সেই ক্ষণ।
        কণ্ঠ হতে ফেলিল হার
              যেন বিজুলিজ্বালা,
        শয়ন'পরে লুটায়ে পড়ে
              ভাবিল রাজবালা--
                  কে পরালে মালা!
        এমনি ধীরে একটি করে
           কাটিছে দিন রাতি।
        বসন্ত সে বিদায় নিল
            লইয়া যূথী-জাতি।
        সঘন মেঘে বরষা আসে,
             বরষে ঝরঝর্‌।
        কাননে ফুটে নবমালতী
             কদম্বকেশর।
        স্বচ্ছ হাসি শরৎ আসে
             পূর্ণিমামালিকা।
        সকল বন আকুল করে
             শুভ্র শেফালিকা।
        আসিল শীত সঙ্গে লয়ে
             দীর্ঘ দুখনিশা।
        শিশির-ঝরা কুন্দফুলে
             হাসিয়া কাঁদে দিশা।
        ফাগুন মাস আবার এল
            বহিয়া ফুলডালা।
        জানালা-পাশে একেলা বসে
             ভাবিছে রাজবালা--
                  কে পরালে মালা!


  ১৫ জ্যৈষ্ঠ  ১২৯৯ শান্তিনিকেতন  

নিদ্রিতা [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]


রাজার ছেলে ফিরেছি দেশে দেশে
সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার।
যেখানে যত মধুর মুখ আছে
বাকি তো কিছু রাখি নি দেখিবার।
কেহ বা ডেকে কয়েছে দুটো কথা,
কেহ বা চেয়ে করেছে আঁখি নত,
কাহারো হাসি ছুরির মতো কাটে
কাহারো হাসি আঁখিজলেরই মতো।
গরবে কেহ গিয়েছে নিজ ঘর,
কাঁদিয়া কেহ চেয়েছে ফিরে ফিরে।
কেহ বা কারে কহে নি কোনো কথা,
কেহ বা গান গেয়েছে ধীরে ধীরে।
এমনি করে ফিরেছি দেশে দেশে।
অনেক দূরে তেপান্তর-শেষে
ঘুমের দেশে ঘুমায় রাজবালা,
তাহারি গলে এসেছি দিয়ে মালা।
    একদা রাতে নবীন যৌবনে
স্বপ্ন হতে উঠিনু চমকিয়া,
   বাহিরে এসে দাঁড়ানু একবার
ধরার পানে দেখিনু নিরখিয়া।
   শীর্ণ হয়ে এসেছে শুকতারা,
পূর্বতটে হতেছে নিশি ভোর।
   আকাশ-কোণে বিকাশে জাগরণ,
ধরণীতলে ভাঙে নি ঘুমঘোর।
   সমুখে পড়ে দীর্ঘ রাজপথ,
দু-ধারে তারি দাঁড়ায়ে তরুসার,
   নয়ন মেলি সুদূর-পানে চেয়ে
আপন মনে ভাবিনু একবার--
   আমারি মতো আজি এ নিশিশেষে
   ধরার মাঝে নূতন কোন্‌ দেশে,
দুগ্ধফেনশয়ন করি আলা
স্বপ্ন দেখে ঘুমায়ে রাজবালা।
   অশ্ব চড়ি তখনি বাহিরিনু,
কত যে দেশ-বিদেশ হনু পার।
একদা এক ধূসর সন্ধ্যায়
ঘুমের দেশে লভিনু পুরদ্বার।
   সবাই সেথা অচল অচেতন,
কোথাও জেগে নাইকো জনপ্রাণী,
   নদীর তীরে জলের কলতানে
ঘুমায়ে আছে বিপুল পুরীখানি।
   ফেলিতে পদ সাহস নাহি মানি,
নিমেষে পাছে সকল দেশ জাগে।
   প্রাসাদমাঝে পশিনু সাবধানে,
শঙ্কা মোর চলিল আগে আগে।
   ঘুমায় রাজা, ঘুমায় রানীমাতা,
   কুমার-সাথে ঘুমায় রাজভ্রাতা;
একটি ঘরে রত্নদীপ জ্বালা,
ঘুমায়ে সেথা রয়েছে রাজবালা।
   কমলফুলবিমল শেজখানি,
নিলীন তাহে কোমল তনুলতা।
   মুখের পানে চাহিনু অনিমেষে,
বাজিল বুকে সুখের মতো ব্যথা।
   মেঘের মতো গুচ্ছ কেশরাশি
শিথান ঢাকি পড়েছে ভারে ভারে;
   একটি বাহু বক্ষ-'পরে পড়ি,
একটি বাহু লুটায় এক ধারে।
   আঁচলখানি পড়েছে খসি পাশে,
কাঁচলখানি পড়িবে বুঝি টুটি;
   পত্রপুটে রয়েছে যেন ঢাকা
অনাঘ্রাত পূজার ফুল দুটি।
   দেখিনু তারে, উপমা নাহি জানি--
   ঘুমের দেশে স্বপন একখানি,
পালঙ্কেতে মগন রাজবালা
আপন ভরা-লাবণ্যে নিরালা।
   ব্যাকুল বুকে চাপিনু দুই বাহু,
না মানে বাধা হৃদয়কম্পন।
   ভূতলে বসি আনত করি শির
মুদিত আঁখি করিনু চুম্বন।
   পাতার ফাঁকে আঁখির তারা দুটি,
তাহারি পানে চাহিনু একমনে,
   দ্বারের ফাঁকে দেখিতে চাহি যেন
কী আছে কোথা নিভৃত নিকেতনে।
   ভূর্জপাতে কাজলমসী দিয়া
লিখিয়া দিনু আপন নামধাম।
   লিখিনু, "অয়ি নিদ্রানিমগনা,
আমার প্রাণ তোমারে সঁপিলাম।"
   যতন করি কনক-সুতে গাঁথি
   রতন-হারে বাঁধিয়া দিনু পাঁতি।
ঘুমের দেশে ঘুমায় রাজবালা,
তাহারি গলে পরায়ে দিনু মালা।


  শান্তিনিকেতন  ১৪ জ্যৈষ্ঠ  ১২৯৯

সোমবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

সোনার তরী [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]


গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
   কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।
            রাশি রাশি ভারা ভারা
            ধান কাটা হল সারা,
            ভরা নদী ক্ষুরধারা
                    খরপরশা।
     কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।

     একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা,
     চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
            পরপারে দেখি আঁকা
            তরুছায়ামসীমাখা
            গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
                    প্রভাতবেলা—
     এ পারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা।

    গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে,
    দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।
            ভরা-পালে চলে যায়,
            কোনো দিকে নাহি চায়,
            ঢেউগুলি নিরুপায়
                    ভাঙে দু-ধারে—
     দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।
    ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্‌ বিদেশে,
     বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে।
            যেয়ো যেথা যেতে চাও,
            যারে খুশি তারে দাও,
            শুধু তুমি নিয়ে যাও
                    ক্ষণিক হেসে
     আমার সোনার ধান কূলেতে এসে।